প্রতিবেদন

যৌতুক প্রতিরোধে সেনবাগের নবযাত্রা
॥ মাওঃ হাফেজ বেলাল হোসাইন ফতেহপুরী ॥

যৌতুক সর্বনাশী বিধ্বংসী ভয়াল এক সামাজিক ব্যাধি। যার কালো থাবায় একটি সাজানো গোছানো সংসার ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। একটি সুন্দর হৃদয় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়। সুখের সংসারে নেমে আসে অশান্তির কালো ছায়া। যার সর্বনাশা ছোবলে শান্তি-সুখের ঠিকানা পারিবারিক জীবন হয়ে ওঠে অত্যন্ত দুর্বিষহ। যৌতুকের বিষাক্ত তীরে বিদ্ধ হয়ে অকালে ঝরে পড়ে অসংখ্য নারী নামের ফুল।

যৌতুকের সংজ্ঞা
যৌতুকের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে বিবাহকালে বর-কন্যাকে প্রদত্ত ধন। ১৯৮০ সনে যৌতুক নিরোধ আইন অনুযায়ী যৌতুকের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, বিয়ের কোন পক্ষ অন্য পক্ষকে বা কোন এক পক্ষের মা-বাবা কর্তৃক বা অন্য ব্যক্তি কর্তৃক অন্যপক্ষকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিয়ের সময় বা বিয়ের আগে বা বিয়ের পরে যে কোন সময় পণ হিসেবে প্রদত্ত বা প্রদানে সম্মত কোন সম্পত্তি বা মূল্যবান জামানতই হচ্ছে যৌতুক। ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী যৌতুকের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, বিয়ে উপলক্ষে বরপক্ষ কন্যা পক্ষের কাছ থেকে বিয়ের আগে, বিয়ের সময় কিংবা বিয়ের পর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শর্তারোপ বা দাবি করে যে সমস্ত অর্থ সামগ্রী বা অন্যবিধ সম্পদ বা অন্য কিছু আদায় করে তাকেই যৌতুক বলে।

মুসলমান সমাজে যৌতুকের প্রবর্তন
আজ থেকে ৩০/৩৫ বছর পূর্বে মুসলমান সমাজে এ কুপ্রথাটির অস্তিত্ব প্রায় ছিল না। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, হিন্দু ধর্মে বহুল প্রচলন থাকায় একই দেশে অবস্থানরত মুসলমান সমাজেও এ কুপ্রথা , এ সংক্রামক ব্যাধি ধীরে ধীরে অত্যাবশ্যকীয় সামাজিক রেওয়াজে পরিণত হয়। এভাবে ঐতিহ্যের আলখেল্লা পরে শরাফতি কায়দায় বেশ পাকাপোক্তভাবে তা শিকড় বিস্তার করে মুসলমান সমাজে। আজ বাংলাদেশে সর্বাধিক বিত্তবান ব্যক্তি কন্যাটিকে যেমন পাহাড় সম যৌতুক দিয়ে বিয়ে দিচ্ছে, ঠিক তেমনি দীনহীন ভিখারীর কন্যাটিকেও কিছু না কিছু যৌতুক দিয়ে উপযুক্ত বা অনুপযুক্ত পাত্রের হাতে সমর্পণ করতে হচ্ছে। আর এ যৌতুক দিতে না পারলেই নারীকে হতে হচ্ছে নির্যাতিত, অপমানিত ও লাঞ্ছিত। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বছরের ৩৬৫ দিনে এরকম একটি দিনও পাওয়া যাবে না যেদিন যৌতুকের কারণে এক বা একাধিক নারী নির্যাতনের বা নারী হত্যা কিংবা নারীর আত্মহত্যার সংবাদ কোন না কোন সংবাদপত্রে ছাপানো হচ্ছে না।
প্রিয় পাঠক! যে যৌতুকের কারণে নারী নিত্যদিন নির্যাতিত, অপমানিত ও লাঞ্ছিত হচ্ছে; প্রতিনিয়ত নারী হত্যা কিংবা নারীর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে, সাজানো সংসার ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হচ্ছে, একটি সুন্দর হৃদয় ভেঙ্গে চুরমার হচ্ছে, সুখের সংসারে নেমে আসছে অশান্তির কালো ছায়া। যার সর্বনাশা ছোবলে শান্তি সুখের ঠিকানা পারিবারিক জীবন হয়ে উঠেছে অত্যন্ত দুর্বিষহ। আমাদের জানতে হবে সে যৌতুকের ব্যাপারে ইসলামের বিধান কী?

ইসলামের দৃষ্টিতে যৌতুক
ইসলামের দৃষ্টিতে বরপক্ষের কনে পক্ষ থেকে দাবি করে যৌতুক গ্রহণ সম্পূর্ণ হারাম। এ প্রসঙ্গে কালামে ইলাহিতে ইরশাদ হচ্ছে যে, বিশ্বাসীগণ বলপূর্বক নারীদের তোমাদের উত্তরাধিকারে গণ্য করা বৈধ নয় (সুরা আন-নিসা, আয়াত ১৯)। তবে বিনা শর্তে বিনা দাবিতে মেয়ের অভিভাবক যদি খুশি মনে স্বেচ্ছায় কিছু প্রদান করে তবে তাকে যৌতুক বলা যাবে না; বরং সেটাকে তোহফা বা হাদিয়া হিসেবে গ্রহণ করা যাবে। রাসুলে কারীম (সঃ) কন্যার বিবাহের প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রদান করেছিলেন, যা কারো ওপর কোন ধরনের চাপ সৃষ্টিতে হয়নি। এ ধরনের উপহারের দ্বারা আত্মীয়তার বন্ধন আরো দৃঢ় হয়। তবে ছেলের পক্ষ থেকে সামান্যতম চাপ বা ইচ্ছা থাকলে তা একেবারে অবৈধ তথা হারাম।

যৌতুক প্রথার কুফল
যৌতুকের কুফল এত বেশি যে, তা এত স্বল্প পরিসরে বর্ণনা করা অসম্ভব বিধায় দৃষ্টান্তস্বরূপ কয়েকটি বর্ণনা পেশ করছি।
বর্তমানে আমাদের পারিবারিক জীবনে অশান্তির জন্য অনেকাংশেই দায়ী এ ঘৃণ্য যৌতুক প্রথা।
আগের যুগে মুসলমান সমাজে বরকে যৌতুক দেয়া তো দূরের কথা বরং মোহরসহ প্রচুর ধনসম্পদ বরের পক্ষ থেকে কনেকেই দেয়া হতো। অথচ বর্তমানে বরপক্ষ যৌতুককে দস্তুরমত বিবাহের পূর্বশর্ত ও তাদের পাওনা বলে মনে করে। আর এ পাওনা আদায় করে তারা তাদের জীবনের আর্থিক প্রতিষ্ঠা লাভের স্বপ্ন দেখে।
বৈবাহিক একটা উদ্দেশ্য হচ্ছে বৈধ উপায়ে যৌনতৃপ্তির মাধ্যমে যৌনচর্চাকে নিয়ন্ত্রিত রাখা। আর এ মহৎ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে যথাসময়ে বিবাহ হওয়া একান্ত প্রয়োজন। অথচ মেয়ের পক্ষ যৌতুকের ব্যবস্থা করতে গিয়ে মেয়ের বিবাহ যথা সময়ে দিতে পারছে না। আর বিবাহ বিলম্বিত হওয়ায় চারিত্রিক পরিত্রতা রক্ষা করা প্রায়ই মুশকিল হয়ে পড়ে। কাজেই প্রচলিত যৌতুক প্রথা চরিত্র নষ্টের কারণ ও সহায়ক।
আজকের সমাজে নারী নির্যাতনের জন্য অনেকাংশেই দায়ী এ জঘন্য যৌতুক প্রথা। এ ঘৃণ্য প্রথার কারণে মহাসম্মানিত মায়ের জাতি হয় নির্যাতিত, অপমানিত ও লাঞ্ছিত। এমনিভাবে ঘৃণ্য প্রথার কারণে আমাদের সমাজে অধিকাংশ সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়েরা মানসম্মান বংশমর্যাদা হারানোর ভয়ে এবং স্বামীর পদতলে নারীর বেহেশতের আশায় যৌতুকলোভী স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি, ননদ তথা যৌতুকলোভী পরিবারের অসহনীয় অত্যাচার-অবিচার, জ্বালা-যন্ত্রণা নীরবে সহ্য করে স্বামীর ঘরে পড়ে থাকে এবং এক সময় ধুঁকে ধুঁকে ঢলে পড়ে মৃত্যুর কোলে। যার বাস্তব চিত্র দৈনিক সংবাদপত্রগুলোতে প্রায়ই ফুটে ওঠে।

যৌতুক প্রতিরোধে আমাদের কর্তব্য
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) কর্তৃক পরিচালিত এক জনমত জরিপে দেখা যায়, দেশের ৯১ শতাংশ লোক যৌতুকবিরোধী। সরকারও এ ব্যাপারে মোটামুটি আন্তরিক। এতদসত্ত্বেও যৌতুক ও নারী নির্যাতন কমার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না; বরং তা আশঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর কারণ কী? উত্তর অত্যন্ত পরিষ্কার। যৌতুক যে মহামারি আকার ধারণ করছে সরকার বা অন্য কারো একার পক্ষে তা প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। যৌতুক প্রতিরোধ করতে হলে দলমত নির্বিশেষে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের প্রতিটি শহর-বন্দর, গ্রামগঞ্জ, পাড়া-মহল্লায় যৌতুকবিরোধী তীব্র সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। ঠিক যেমনটি গড়ে উঠেছিল পরীক্ষার কেন্দ্রগুলোতে নকলের বিরুদ্ধে। নকলের আগ্রাসনে আমাদের জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার মেরুদন্ড যখন ভেঙ্গে প্রায় চুরমার, ঠিক সেই মুহূর্তে এর বিরুদ্ধে গড়ে ওঠে তীব্র সামাজিক আন্দোলন। প্রশাসনের সদিচ্ছায় নকলের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সেই সামাজিক আন্দোলনের সুফল আমরা ইতোমধ্যে পেয়েছি। বর্তমানে পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতে নকল প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে। এর থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে এবং সেটা কাজে লাগিয়ে যৌতুকসহ যাবতীয় সামাজিক সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হতে হবে। আমাদেরকে বুঝতে হবে প্রশাসনের সদিচ্ছা এবং ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ফলে যদি পরীক্ষা কেন্দ্রে নকল বন্ধ হতে পারে তবে ঘৃণ্য যৌতুক প্রথা কেন বন্ধ হবে না? অবশ্যই হবে!

সেনবাগ থেকে যৌতুক প্রতিরোধের ডাক
পাঠক! যৌতুক একটি ধ্বংসাত্মক সামাজিক ব্যাধি। একে প্রতিরোধ করা আপনার-আমার সকলের নৈতিক ও ঈমানী দায়িত্ব। সুতরাং যৌতুক প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন বর্তমান সময়ের অপরিহার্য দাবি। সে দাবি পূরণে সর্বপ্রথম এগিয়ে এসেছেন সেনবাগের একদল নিবেদিতপ্রাণ সমাজকর্মী। যাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ২০০৩ সালের ১৯ অক্টোবর সেনবাগ প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভার মাধ্যমে ‘যৌতুক প্রতিরোধ আন্দোলন বাংলাদেশ’ নামে একটি সংগঠন যৌতুক প্রতিরোধের ডাক দিয়ে যাত্রা শুরু করে। সমাজ থেকে যৌতুক প্রথা এবং যাবতীয় কুসংস্কার চিরতরে উচ্ছেদ করার আন্দোলনে শরিক হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।

 
     
lbheading